সন্ধ্যার ছায়া ঘন হয়ে এসেছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায় গাছের পাতা নড়ছে হালকা বাতাসে। কিন্তু তমার মনে কোনো শান্তি নেই। গরম হাঁড়ির ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে, অথচ তার কাজ শেষ হয়নি। শ্বশুরবাড়িতে আসার পর থেকে জীবনটা যেন এক অবিরাম চক্র। কাজ, কাজ, আর কাজ।
তমা বিয়ে করেছিল হাজারো স্বপ্ন নিয়ে। ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে সে ভেবেছিল, তার জীবন এক নতুন আনন্দময় পথে পা রাখল। কিন্তু এই শ্বশুরবাড়ি তার স্বপ্নের জায়গা নয়, বরং এক কঠিন বাস্তবতার আখড়া। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তমার কাজ যেন শেষ হয় না। রান্না করা, বাসন ধোয়া, ঘর পরিষ্কার—সবকিছুর দায়িত্ব তার।
অথচ দিনের শেষে কোনো স্বীকৃতি নেই। বরং একেকটা ভুলের জন্য শাশুড়ির রাগ, ননদের কটূক্তি, দেবরের নির্লজ্জ হাসি। তমা বুঝে যায়, এখানে তার ভালোবাসার মানুষটিরও কিছু বলার অধিকার নেই। স্বামী মানসিকভাবে তার পরিবারের কাছে এমনভাবে বাঁধা যে, তমার প্রতি ভালোবাসা দেখানো মানেই সমাজের বিরুদ্ধে যাওয়া। তমা প্রতিদিন হাসি মুখে সবার সেবা করে, কিন্তু তার ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসে।
তমা চুপ থাকে। কোনো কিছুর উত্তর দেয় না। উত্তর দিলেও তো লাভ নেই। এ বাড়িতে তার কথা কেউ শুনবে না। রাত হলে সে একা নিজের ঘরে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। চেয়ারের কোণে রাখা ফোনটার দিকে তার দৃষ্টি পড়ে। সে ভেবে পায় না, মাকে ফোন করবে কি না। মা হয়তো শুনেই কেঁদে ফেলবেন। বাবার বয়স হয়েছে। তিনি কিছুই করতে পারবেন না।
তমার ভেতরে এক শূন্যতা জমতে থাকে। সে ভাবে, এই জীবন কি তার নিজের? শ্বশুরবাড়ির অদৃশ্য শিকল কি তাকে চিরতরে বেঁধে রেখেছে? এমন সময় স্বামী ঘরে আসে। চোখে কোনো তাপ নেই, মুখে কোনো কথা নেই। তমা জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি বুঝতে পারো না, আমি কতটা কষ্টে আছি?”
স্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু তমা জানে, কিছুই ঠিক হবে না। তার জীবন এভাবেই চলতে থাকবে, যতক্ষণ না সে নিজে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়।
রাতে তমা আবার শুয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম আসে না। আকাশে মেঘ জমেছে। হয়তো একদিন বৃষ্টি হবে, হয়তো ঝড় উঠবে। তমা জানে না, সেই ঝড় তার জীবনে কোনো পরিবর্তন আনবে কি না।
লেখক: নিশাত জামান