ওমানের তপ্ত মরুভূমির রোদে দিন কাটে রাশেদের। সকাল সাতটায় কাজ শুরু, আর শেষ হয় কখনো সন্ধ্যায়, কখনো রাতের দিকে। নির্মাণ সাইটে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সে। ভারী ইট-পাথর আর রডের বোঝা কাঁধে নিয়ে সারাদিন দম ফেলার ফুরসত পায় না। রোদে ঘেমে-নেয়ে শরীর ক্লান্ত হলেও রাশেদের মন পড়ে থাকে একটা জায়গায়—তার ছোট্ট মেয়ে মিমের কাছে।
প্রায় চার বছর হলো রাশেদ ওমানে এসেছে। দেশে ঋণের বোঝা আর ভালো জীবনের স্বপ্ন তাকে হাজার মাইল দূরের এই দেশে টেনে এনেছিল। কিন্তু এই পরবাস জীবনের কষ্টের তুলনায় আয় যেন খুব সামান্য। নিজের খরচ বাঁচিয়ে প্রতিমাসে দেশে টাকা পাঠায় সে। মিমের পড়াশোনা, স্ত্রীর ছোটখাটো চাহিদা, আর বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের খরচ—সবই তো তার একার দায়িত্ব।
কিন্তু দিন শেষে যখন ক্লান্ত শরীরে ব্যারাকে (দলবদ্ধভাবে থাকার জায়গা) ফিরে আসে, তখন তার মনে শান্তি আসে একটা জিনিসে—মিমের ভিডিওকলে দেখা মুখ। খাওয়া শেষ করেই সে ফোন তুলে নেয়। অন্য প্রান্ত থেকে মেয়ের চিৎকার ভেসে আসে, “বাবা! তুমি কেমন আছো?” ছোট্ট হাতদুটো ক্যামেরার দিকে তুলে সে বলে, “বাবা, তুমি কখন আসবা?”
রাশেদের চোখে পানি চলে আসে, কিন্তু সে লুকিয়ে ফেলে। মেয়ে যেন দুঃখ বুঝতে না পারে। হাসি মুখে বলে, “বাবা খুব তাড়াতাড়ি আসবে, মা। তুমি ভালো থাকো, দুষ্টুমি কোরো না।” মিম তার ছোট ছোট গল্প বলতে থাকে—কী খেলল, কী শিখল। রাশেদ সেগুলো মন দিয়ে শোনে।
এই ছোট্ট সময়টাই তার দিনের সবচেয়ে সুখের সময়। তখন মনে হয়, তার কষ্টের কোনো মূল্য আছে। মেয়ে যখন ক্যামেরার দিকে হাত নেড়ে “বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলে, তখন যেন পুরো দিনের ক্লান্তি ভুলে যায় রাশেদ।
কিন্তু ফোনের লাইন কাটার সঙ্গে সঙ্গে তার বাস্তবতা আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। ছোট্ট ঘরের কোণে বসে সে ভাবে, “আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে? মিম বড় হয়ে গেলে কি আমাকে ঠিকমতো চিনবে? আমি কি তার শৈশবের সঙ্গী হতে পারব?”
রাশেদ জানে, প্রবাস জীবনের কষ্ট চিরস্থায়ী নয়। একদিন হয়তো সব ঋণ শোধ হবে, সব দায়িত্ব শেষ হবে। তখন সে ফিরে যাবে তার মেয়ের কাছে। কিন্তু আজকের এই ক্লান্ত দিনগুলো মিমের ছোট্ট হাসি আর “বাবা” ডাকার শব্দেই কিছুটা হলেও সহনীয় হয়ে ওঠে।
লেখক: মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম