দিনটা শুরু হয় ভোরবেলা। চারপাশ তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। রান্নাঘরের আগুন জ্বলে ওঠে, চায়ের কেটলি ফুসফুসের মতো শ্বাস নিতে থাকে। মরিয়মের সকাল মানেই একগাদা কাজ। দুই সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, স্বামীকে অফিসে বিদায় জানানো, আর নিজে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া।
মরিয়মের বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে। একসময় কলেজে পড়ার সময় সে ভেবেছিল, চাকরি করবে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য। কিন্তু সময়ের চক্রে সেই চাকরিটাই হয়ে গেছে বেঁচে থাকার সংগ্রামের একমাত্র হাতিয়ার। মাসে ১২ হাজার টাকা বেতন। এই সামান্য টাকায় দুই সন্তানের স্কুল ফি, সংসারের খরচ আর ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো টিকে থাকে কষ্টের বুননে।
আজ অফিসে যেতে একটু দেরি হয়ে গেল। স্কুলের সামনে বাস থামতে চায় না। মরিয়ম এক হাতে বড় মেয়ের হাত ধরে আরেক হাতে ছোট ছেলেকে বুকের কাছে টেনে ঝাঁকি সামলাতে ব্যস্ত। বাসের ভেতর ধাক্কাধাক্কির মাঝেও তার মনে শুধু একটাই চিন্তা—সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে হবে।
অফিসের বস তার দেরি কখনো মেনে নেয় না। একবার দেরি করলেই সারাদিন মুখ গোমড়া করে থাকে। আজও মরিয়ম সবার আগে ডেস্কে গিয়ে বসে। কাজের ফাইল খুলে হাত চালাতে থাকে। মাথায় তখন ঘুরপাক খায় সন্তানের স্কুলের বেতন, পরের মাসের বাজার খরচ আর ভাঙা জুতার কথা।
বিকেল ৫টা বাজে অফিস শেষ হওয়ার সময়। কিন্তু বাসে উঠতে উঠতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ঠাসা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে থাকে—এভাবে আর কতদিন? জীবন যেন একটা থেমে থাকা ট্রেন, যে এগোতে পারে না, আর পেছনেও ফিরতে পারে না।
বাড়ি ফিরে রান্নার কাজ শুরু করে মরিয়ম। হাত-পা ব্যথায় কাবু হলেও থেমে থাকার উপায় নেই। ছোট ছেলেটা খিদে পেয়ে কান্না করে। বড় মেয়ে বলে, “মা, আমার হোমওয়ার্ক করিয়ে দাও।” স্বামী এসে প্রশ্ন করেন, “খাওয়া তৈরি হয়নি এখনো?”
সব সামলে রাত ১১টায় নিজের বিছানায় যখন শুতে যায়, তখনও মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে একগুচ্ছ চিন্তা। একদিন ছেলেমেয়ে বড় হবে, তাদের জন্য এই সংগ্রাম হয়তো ফল দেবে। হয়তো তখন কেউ বুঝবে তার এই ত্যাগের মূল্য। চোখের পাতা এক করতে করতে মরিয়ম ভাবতে থাকে, “আমার ক্লান্তি যেন আমার সন্তানদের জীবনে আর না আসে।”
তবু পরের দিন ভোরবেলা আবার সেই একই যুদ্ধ শুরু হবে। মরিয়ম জানে, তার জীবন গল্প নয়, এক চলমান সংগ্রাম। কিন্তু সে থামতে চায় না। তার কাছে থেমে যাওয়া মানে স্বপ্নের মৃত্যু।
লেখক: জান্নাতুল মাওয়া