আমাদের পরিবারগুলোতে স্বপ্ন দেখতে শেখানো হয় ছোটবেলা থেকেই। বাবা-মা বলেন, “ভালো করে পড়াশোনা করো, জীবনে বড় কিছু হবে।” সেই কথাগুলো হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে আমি পথচলা শুরু করি। স্কুলে ভালো ফল করলাম, কলেজেও ভালো করলাম। এরপর সুযোগ পেলাম দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ এবং এমবিএ করার। কিন্তু কেউ আমাকে বলেনি, এই সোনার হরিণের পিছনে ছুটেও, হয়তো একদিন সব স্বপ্ন বালির মতো হাত ফসকে যাবে।
পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন করতাম। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাবার কাঁধ থেকে কিছুটা হলেও বোঝা কমানোর চেষ্টা করতাম। বাবা একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি করেন। সামান্য এই ইনকাম দিয়েই তিনি আমাদের চার ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন, বড় দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। বাবার মুখের ক্লান্তি দেখলে নিজেকে ছোট মনে হতো। তাই মনে হতো, “একদিন আমি ভালো চাকরি করে বাবার পাশে দাঁড়াব। আমাদের এই কষ্টের দিন শেষ হবে।”
কিন্তু জীবন তো পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। মাস্টার্স শেষ করেছি মাসখানেক হলো। একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কোথাও চাকরি পাচ্ছি না। এই দেশে শিক্ষার মান আছে, কিন্তু সেই শিক্ষা কোনো কাজের মান তৈরিতে কতটুকু সফল? আমার চার বছরের বিবিএ, দুই বছরের এমবিএ আমাকে একটি চাকরির জন্য যোগ্য প্রমাণ করতে পারছে না।
গত সপ্তাহে একটি প্রাইভেট ফার্ম থেকে অফার পেলাম। প্রথমে আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু বেতন মাত্র ৮০০০ টাকা! সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করে এই টাকায় কীভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়াব? বাবার জন্য কিছু করতে তো পারবই না, উল্টো নিজের খরচও চালাতে পারব না। চাকরিটা নিতে পারলাম না।
এই দেশে চাকরির বাজার যেন মেধার অবমূল্যায়নের এক কঙ্কাল। কী কারণে আমার মতো হাজারো শিক্ষিত তরুণ আজ বেকার, সেই উত্তর কারো জানা নেই। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সৃজনশীলতা বা বাস্তব দক্ষতা তৈরি করতে ব্যর্থ। আমরা শুধু সার্টিফিকেটের ভার নিয়ে ঘুরি।
রাতে ঘরে ফেরার সময় বাবার ক্লান্ত মুখ দেখি। মা জিজ্ঞেস করেন, “কিছু হলো?” কিছুই তো বলার থাকে না। বুকভরা কষ্ট নিয়ে বলি, “হবে মা, শিগগিরই হবে।” কিন্তু আমি জানি, এই “শিগগিরই” শব্দটা যেন দিন দিন আরও দীর্ঘ হয়।
আমি জানি না, এই কষ্টের গল্প কতদিন চলবে। তবে একটাই কথা বলি—এই সমাজে প্রতিটি তাহসিনের গল্প যেন একদিন পরিবর্তিত হয়। তাদের স্বপ্নগুলো যেন কঙ্কালের মতো না ঝরে পড়ে।
লেখক: তাহসিন বিন আমান