ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ দেড় বছর পার হলেও রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো কার্যকর পথ খুঁজে পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে আন্দোলনের মুখে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যাওয়া শেখ হাসিনা নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ দল গঠনের যে আলোচনা উঠেছিল, তা কার্যত ভেস্তে গেছে। ক্ষমতার চাবিকাঠি হারিয়ে মাঠের নিয়ন্ত্রণহীন দলটির নেতারা এখন এক অনিশ্চিত ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ দিন পার করছেন।
সংস্কারের চেষ্টা ও শেখ হাসিনার অনড় অবস্থান
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দলটির বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশ ও আন্তর্জাতিক শুভাকাঙ্ক্ষীরা আওয়ামী লীগকে একটি ‘পরিশুদ্ধ’ ফর্মে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শ ছিল—বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে দলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া।
তবে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের পদ ছাড়তে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বড়জোর সাধারণ সম্পাদকের বিকল্প হিসেবে বিদেশে অবস্থানরত নিজের পছন্দের কোনো নেতাকে দলের মুখপাত্র করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রস্তাবে সংস্কারপন্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ আশ্বস্ত হতে পারেননি। ফলে দলের ভেতর থেকে সংস্কারের যাবতীয় সম্ভাবনা আপাতত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
তৃণমূলে তীব্র হতাশা, জ্যেষ্ঠদের নিষ্ক্রিয়তার চেষ্টা
বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং বিএনপি সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অধিকাংশ নেতাকর্মীর মধ্যে তীব্র হতাশা কাজ করছে। এর ফলে নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, যেসব সাবেক এমপি ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের বড় ধরনের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, তারা এখন রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন। অনেকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়ার নিশ্চয়তা পেলে দেশে ফেরার কথা ভাবলেও, বর্তমান বাস্তবতায় সরকার তাদের কোনো প্রকার ছাড় দেবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিদেশে আশ্রিত নেতাদের অর্থসংকট ও দেশ বদল
ভারত, ইউরোপ এবং মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের মাঝারি ও শীর্ষ সারির অনেক নেতাই বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন বলে তথ্য মিলেছে। তাছাড়া, ভারতের বর্তমান প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সম্পর্ক ভালো হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভারত ছাড়ছেন। তারা এখন মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো ভিন্ন দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন।
কট্টরপন্থীদের দাপট ও ‘ভুল স্বীকার’ না করার নীতি
দলের সংস্কারপন্থী অংশ কোণঠাসা হয়ে পড়ায় বর্তমানে অবশিষ্টাংশের মধ্যে কট্টরপন্থী নেতারাই সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। তারা কোনো অবস্থাতেই শেখ হাসিনার বিকল্প দেখছেন না এবং গত ১৫ বছরের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য ভুল স্বীকার বা অনুশোচনার পথে হাঁটতে নারাজ। তাদের ধারণা, বর্তমান সরকার কোনো বড় ভুল করলে বা জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠলে তারা পুনরায় মাঠে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবেন। কট্টরপন্থীদের মতে, দল যদি কখনো পুনরায় কাজ করার অনুমতি পায়, তবে তা অবশ্যই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কাঠামোতেই হতে হবে।
গোপনে গোছানোর চেষ্টা ও ভবিষ্যৎ
বর্তমানে দলটির প্রকাশ্য কোনো কার্যক্রম না থাকলেও পর্দার আড়ালে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশে ও আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, কলকাতার একটি পক্ষ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি একটি অংশ নিয়মিত অনলাইনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গায়ের জোরে বা চক্রান্তের মাধ্যমে রাজনীতিতে ফেরার চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে। দলটির উচিত ছিল গত ১৫ বছরের শাসন আমলের অপরাধ ও দমনপীড়নের জন্য জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং জবাবদিহি করা। কিন্তু সেই পথ এড়িয়ে চলায়, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।