ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তির আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে ইসরাইলকে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সম্ভাব্য সমঝোতায় স্বাভাবিকভাবেই চরম ক্ষুব্ধ তেল আবিব। তবে এমন টানাপোড়েনের মাঝেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ফাটল ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর ড্যামেজ কন্ট্রোল ও খসড়া নিয়ে ক্ষোভ
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে পর্দার আড়ালে তীব্র উত্তেজনা চলছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (X) একটি পোস্ট করেছেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি দাবি করেন, বাহ্যিক মতপার্থক্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী।
যদিও খোদ ইসরাইলের ভেতরেই এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের তৈরি করা যে খসড়া প্রস্তাবটি দেখেছেন, তাতে তারা মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
ইসরাইলের মূল উদ্বেগ যেখানে
দখলকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক নিদা ইব্রাহিম জানিয়েছেন, ইসরাইলের প্রধান আপত্তির জায়গা হলো চুক্তির দুর্বল শর্তাবলী। তেল আবিব মনে করছে, এই খসড়া চুক্তিতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে চুক্তি হলেও ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অধরাই থেকে যাবে, যা ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।
ট্রাম্পকে চটাতে চান না নেতানিয়াহু
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সাথে কোনো ধরনের দ্বন্দ্বে জড়াতে চাচ্ছেন না নেতানিয়াহু। আল জাজিরা জানিয়েছে, এই চুক্তি নিয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য বা উসকানিমূলক বক্তব্য না দিতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক সামলাতে তিনি অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন এবং এই মুহূর্তে মার্কিন প্রশাসনের সাথে কোনো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হোক—তা তিনি চান না।
সামরিক তৎপরতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা
ইসরাইলি গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’–এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই চুক্তির পরোক্ষ প্রভাবে লেবাননে চলমান সংঘাত শেষ হলে ওই অঞ্চলে ইসরাইলের একক সামরিক আধিপত্য ও তৎপরতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে যেতে পারে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) ভেতরেও এই নিয়ে তীব্র আশঙ্কা কাজ করছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি লেবানন থেকে হওয়া ক্রমাগত ড্রোন হামলায় ইসরাইলি সেনা ও বেসামরিক হতাহতের ঘটনা তেল আবিবের রক্তচাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইসরাইল ছায়াযুদ্ধের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সবসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলেও, এখন দুই মিত্রের মধ্যে স্পষ্ট নীতিগত মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতা চাইছে, সেখানে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে হিজবুল্লাহ ও ইরান ইস্যুতে ইসরাইলের আগ্রাসী সামরিক কৌশল পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে।