বিশেষ প্রতিবেদন:
থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা অভিযোগপত্র জমা দিতে গিয়েছেন? টেবিলের ওপাশ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়তো সরাসরিই একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘খরচ’ চেয়ে বসলেন। নির্বাচন কমিশন অফিসে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন করতে গিয়ে মাসের পর মাস ঘুরছেন, কিন্তু টেবিলের তলা দিয়ে টাকা না দিলে ফাইল নড়ছে না। ভূমি অফিসে বা পিডিবি’র বিদ্যুৎ অফিসে তো কথাই নেই; একটি নতুন মিটারের আবেদন থেকে শুরু করে নামজারির খতিয়ান—সবখানেই টাকার খেলা।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সাধারণ নাগরিকেরই কোনো না কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেবা পাওয়ার এই চিরচেনা ভোগান্তি আর অলিখিত ঘুষের সংস্কৃতি এখন রাষ্ট্রের জন্য এক মরণঘাতী ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চলমান সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের চরম অপেশাদার ও জবাবদিহিতাহীন আচরণ। সেবাগ্রহীতা সাধারণ মানুষ যখনই কোনো নিয়মের ব্যত্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা কাজের যৌক্তিক সময় জানতে চান, তখনই কর্মকর্তাদের কাছ থেকে একটি চটজলদি ও অহংকারী উত্তর আসে—‘বেশি বুঝলে কাজটা আপনিই করেন’ অথবা ‘নিয়ম শেখাতে আসবেন না।’
জনগণ যেখানে প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের সেবক (Public Servant), সেখানে উল্টো সেবাগ্রহীতাদেরই নিগৃহীত হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ক্ষমতার এই অপব্যবহার এবং নাগরিকের আত্মসম্মানে আঘাত হানার এই সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ বুকে চেপে রাখলেও মুখে কিছু বলছেন না। এর মূল কারণ দুটি—‘কাজের তাগিদ’ এবং ‘হয়রানির ভয়’। একজন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জানান,
“থানায় বা ভূমি অফিসে গিয়ে যদি আমি প্রতিবাদ করি, তবে আমার জরুরি কাজটি তো আটকে যাবেই, উল্টো তারা আমাকে এমন আইনি প্যাঁচে ফেলবে যে কোর্ট-কাচারি করতে করতে আমার জীবন পার হয়ে যাবে। তাই বাধ্য হয়ে পকেট থেকে বাড়তি টাকা দিয়ে কাজ আদায় করে বাড়ি ফিরি।”
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাহস দিন দিন আরও বাড়ছে। অভিযোগ জানানোর জন্য ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’ বা ‘দুদকের ১০৬’ এর মতো হটলাইন থাকলেও, মাঠ পর্যায়ের দৃশ্যমান পরিবর্তন এখনো সুদূরপরাহত।
জনগণকে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনি প্রক্রিয়ায় এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হবে। প্রশাসন যদি তাদের ‘সেবক’ মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে যাবে।