পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ ‘আশুরা’ মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে রোজা রাখা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত আমল। তবে আমাদের সমাজে একটি বড় অংশের মানুষের মনে এই দীর্ঘমেয়াদী ভুল ধারণা বা বিশ্বাস রয়েছে যে, এই রোজাটি মূলত হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণের শোক পালনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়। সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব এবং লোকমুখে প্রচলিত কাহিনীর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার কারণে অনেকেই জানেন না যে, আশুরার রোজার মূল বিধান ও ফজিলত কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির বহু আগে থেকেই ইসলামে নির্ধারিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, কারবালার ঘটনার জন্যই যদি এই রোজাটি হতো, তবে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেন তাঁর জীবদ্দশায় এত বছর আগে নিজেই এই রোজা রাখতেন এবং উম্মাহকে রাখার নির্দেশ দিতেন—এই যৌক্তিক প্রশ্নটি অনেকেরই অজানাই থেকে গেছে।
ইসলামের সঠিক ইতিহাস ও বিশুদ্ধ হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বৈরশাসক ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে শহীদ হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরি ৬১ সনে। অন্যদিকে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরি ১১ সনে ইন্তেকাল করেন। অর্থাৎ, কারবালার এই দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল প্রিয় নবী (সা.)-এর ইন্তেকালেরও প্রায় ৫০ বছর পর। স্বভাবতই, নবীজির ইন্তেকালের অর্ধশতক পরে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে তার এত বছর আগে আশুরার রোজার মতো একটি ইবাদতের বিধান প্রবর্তন হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আশুরার রোজা মূলত মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি ইবাদত, যা হযরত মুসা (আ.)-এর আমল এবং মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
হাদিস শরিফের বিবরণ অনুযায়ী, মহানবী (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে মদিনার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখছে। এর কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এই পবিত্র দিনে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইল সম্প্রদায়কে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে অলৌকিক উপায়ে লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত করে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং জালিম ফেরাউনকে সলিল সমাধি করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হযরত মুসা (আ.) এই রোজা রাখতেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন যে, মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ব্যাপারে মুসলিমরাই বেশি হকদার এবং তিনি নিজে রোজা রাখেন ও মুসলিমদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
সহীহ মুসলিমের হাদিসে এই রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে বান্দার বিগত এক বছরের ছোট গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তাই কারবালার শোকের সাথে এই রোজার কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এটি সম্পূর্ণ একটি সুন্নাত ইবাদত, যা ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রাখা উত্তম।