বর্হিজগতের কোলাহল থেকে দূরে, বোর্নিও দ্বীপের উত্তর উপকূলে লুকিয়ে থাকা এক রাজকীয় বিস্ময়— ব্রুনাই। পুরো নাম ‘ব্রুনাই দারুসসালাম’, যার অর্থ ‘শান্তির আবাস’। এটি বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র অথচ ধনী রাষ্ট্র। এখানে তেলের সমুদ্রের ওপর গড়ে উঠেছে এক স্বর্ণোজ্জ্বল সভ্যতা, যেখানে রাজপ্রাসাদের জৌলুস আর প্রকৃতির শান্ত রূপ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ব্রুনাইয়ের রাস্তায় হাঁটলে মনে হবে আপনি কোনো আধুনিক রূপকথার রাজত্বে প্রবেশ করেছেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক রহস্যময় ব্রুনাই সম্পর্কে ৫টি চমকপ্রদ তথ্য:
১. বিশ্বের অন্যতম ধনী রাজপ্রাসাদ: ইস্তানা নুরুল ইমান
ব্রুনাইয়ের সুলতানের বাসভবন ‘ইস্তানা নুরুল ইমান’ হলো বিশ্বের বৃহত্তম আবাসিক রাজপ্রাসাদ। প্রায় ১৭ লক্ষ বর্গফুট আয়তনের এই প্রাসাদে ১,৭৮৮টি কক্ষ, ২৫৭টি বাথরুম, একটি বিশাল মসজিদ এবং ৫টি সুইমিং পুল রয়েছে। প্রাসাদটির গম্বুজগুলো খাঁটি সোনা দিয়ে মোড়ানো। মজার ব্যাপার হলো, বছরের বেশিরভাগ সময় এই প্রাসাদটি সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ থাকলেও, ঈদের ছুটির সময় তা উন্মুক্ত থাকে এবং সুলতান স্বয়ং তার প্রজাদের সাথে দেখা করেন!
২. জলের ওপর ভাসমান গ্রাম: কাম্পং আয়েরার
ব্রুনাইয়ের রাজধানী বন্দরি সেরি বেগাওয়ানের ঠিক পাশেই কেল্লা নদীর ওপর যুগ যুগ ধরে টিকে আছে এক প্রাচীন বসতি, যার নাম ‘কাম্পং আয়েরার’। এটিকে বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম ভাসমান গ্রাম। কাঠের খুঁটির ওপর নির্মিত এই গ্রামে হাজার হাজার মানুষ বাস করে। তাদের যাতায়াতের জন্য রয়েছে জল ট্যাক্সি বা স্পিডবোট। এখানে স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল—সবকিছুই জলের ওপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।
৩. আয়ের উৎস যেখানে তেল ও গ্যাস
ব্রুনাইয়ের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। এই ক্ষুদ্র দেশটির খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে ব্রুনাইবাসীর জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত উচ্চ। এখানকার নাগরিকদের কোনো ব্যক্তিগত আয়কর দিতে হয় না! এছাড়া তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন খরচ সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা অত্যন্ত নামমাত্র মূল্যে প্রদান করে।
৪. কঠোর আইন এবং অ্যালকোহল নিষিদ্ধ
ব্রুনাই একটি অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা দেশ। এখানকার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক নিয়ম হলো, পুরো দেশের কোথাও আপনি কোনো অ্যালকোহল বা মদ কিনতে পারবেন না এবং প্রকাশ্য স্থানে পান করতে পারবেন না। অমুসলিম পর্যটকরাও বাইরে থেকে সীমিত পরিমাণে নিজেদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কোটায় তা আনতে পারেন, তবে তা কঠোর গোপনীয়তার সাথে রাখতে হয়।
৫. সবুজ বনের রত্ন: উলু তেম্বুরং ন্যাশনাল পার্ক
ব্রুনাইয়ের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি অংশজুড়ে রয়েছে চিরহরিৎ রেইনফরেস্ট। এর মধ্যে ‘উলু তেম্বুরং ন্যাশনাল পার্ক’ হলো দেশটির মুকুটে যুক্ত এক সবুজ হিরে। পরিবেশ রক্ষার জন্য এই বনের ৯০ শতাংশ এলাকায় মানুষকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। বনের ওপর দিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে রয়েছে একটি বিশাল ক্যানোপি ওয়াক, যেখান থেকে পুরো সবুজ অরণ্যটিকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মনে হয়।
ব্রুনাইয়ের এই সোনালী রাজপ্রাসাদ আর জলের ওপর ভাসমান গ্রামের জীবনযাত্রা কি আপনাকে মুগ্ধ করেছে? বোর্নিও দ্বীপের এই শান্ত ও সমৃদ্ধ দেশটি সত্যিই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।