দক্ষিণ আফ্রিকার সাহারা কিংবা এশিয়ার গোবি মরুভূমির কথা সকলের জানা থাকলেও পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক অবাসযোগ্য প্রান্তর হিসেবে চিহ্নিত চিলির ‘আতাকামা মরুভূমি’। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে আন্দিজ পর্বতমালার পশ্চিমে অবস্থিত এই রহস্যময় মরুভূমিটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও শুষ্ক অ-মেরু অঞ্চলীয় প্রভার এলাকা হিসেবে স্বীকৃত।
প্রায় ১,০৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল অঞ্চলে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ১ মিলিমিটার (০.০৪ ইঞ্চি)। এমনকি আতাকামার কেন্দ্রস্থলের কিছু আবহাওয়া কেন্দ্রে কখনো এক ফোঁটা বৃষ্টির রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। ইতিহাস অনুযায়ী, এখানে কিছু কিছু স্থানে টানা ৪০০ বছর ধরে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি! মূলত পূর্ব দিক থেকে আসা আর্দ্র বাতাস আন্দিজ পর্বতমালায় বাধা পেয়ে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ফেলে, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের শীতল হামবোল্ট স্রোত বাষ্পীভবনে বাধা দেয়—এই দুইয়ের যৌথ প্রভাবই আতাকামাকে পৃথিবীর তীব্রতম শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত করেছে।

আতাকামা মরুভূমির মাটি ও আবহাওয়া এতটাই শুষ্ক ও প্রতিকূল যে বিজ্ঞানীরা একে পৃথিবীর বুকে ‘মঙ্গল গ্রহের যমজ’ বলে মনে করেন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মঙ্গল গ্রহে রোভার পাঠানোর পূর্বে তাদের বিভিন্ন রোবটিক যন্ত্রপাতি এবং ‘মার্স মিশন’-এর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এই মরুভূমির মাটিতেই সম্পন্ন করে থাকে। এছাড়া, অতিরিক্ত শুষ্কতা ও মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশের কারণে বিশ্বমানের প্রধান প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞান অবজারভেটরি এখানে স্থাপন করা হয়েছে।
বাইরে থেকে আতাকামাকে পুরোপুরি প্রাণহীন মনে হলেও চরম ভাবাপন্ন এ পরিবেশে কিছু বিশেষ প্রজাতির ক্যাকটাস, অণুজীব এবং অ্যালজি বেঁচে থাকে। এখানকার চরম শুষ্ক বাতাসে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভেসে আসা কুয়াশা (যাকে স্থানীয়রা ‘কামেনচাকা’ বলে) উদ্ভিদের বেঁচে থাকার প্রধান জলের উৎস। তবে আতাকামার সবচেয়ে চমৎকার রূপ দেখা যায় প্রাকৃতিকভাবে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত হলে। কয়েক বছর পরপর অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হলে সুপ্ত বীজ থেকে একরাতে হাজার হাজার বিচিত্র রঙিন ফুল ফুটে ওঠে, যা ‘মরুভূমির পুষ্পপ্রস্ফুটন’ নামে পরিচিত।
বিজ্ঞানী ও পর্যটকদের কাছে আতাকামা কেবল একটি মরুভূমিই নয়, এটি পৃথিবীর বুকে এক অন্যতম প্রাকৃতিক বিস্ময় এবং চরম প্রতিকূলতার মাঝে বেঁচে থাকার অনন্য প্রতীক।