মোজাম্বিক—দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার একটি সম্ভাবনাময় দেশ, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষি খাতের বিশাল সুযোগ রয়েছে। এই দেশে প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবসায় জড়িত। এখানকার বাংলাদেশি প্রবাসীরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছেন। তবে প্রবাস জীবনের সংগ্রাম ও সাফল্যের মধ্যে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—দূতাবাসের অনুপস্থিতি। আমার দীর্ঘ এক যুগের কাছাকাছি মোজাম্বিকে থাকা এবং ব্যবসা করার মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বিষয় নিয়ে লিখছি আজ।
প্রবাসীদের জীবন ও ব্যবসার চিত্র
মোজাম্বিকের বাংলাদেশি প্রবাসীদের প্রধান আয়ের উৎস হলো ব্যবসা। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় একটি ব্যবসা হলো “মারসিরিয়া” বা মুদি দোকান। এছাড়া, কৃষি পণ্য ব্যবসাও অনেক বাংলাদেশির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রবাসীরা চাল, ডাল, মসলা, শাকসবজি থেকে শুরু করে বাংলাদেশি তৈরি পণ্যের বেচাকেনা করে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি স্থানীয়দের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই চাহিদা ব্যবসায়ীদের জন্য যেমন আশার আলো, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।
চ্যালেঞ্জের গল্প
মোজাম্বিকের ব্যবসায়িক পরিবেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তার অভাব। চুরি ও লুটপাটের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত সম্পদ কখনো কখনো এক রাতের মধ্যেই হারিয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক নির্বাচনী সহিংসতায় আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি করেছে। এতে অনেক ব্যবসায়ী একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া, প্রশাসনিক কাজকর্মেও জটিলতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হলে আইনগত সমস্যায় পড়তে হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে ব্যবসার অংশীদারিত্ব করাও কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কনস্যুলেটের অভাব এবং তার প্রভাব
মোজাম্বিকে বাংলাদেশ দূতাবাস নেই। প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাধ্য।
করোনা মহামারীর সময় এর একটি মর্মান্তিক দিক প্রকাশ পায়। এক প্রবাসী বাংলাদেশি মারা যাওয়ার পর, তার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি শুধুমাত্র দূতাবাসের সেবার অভাবে। এই ঘটনার মানসিক কষ্ট আমার মতো অনেক প্রবাসীর মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।
দূতাবাস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন সহজ করতে এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মোজাম্বিকে একটি কনস্যুলেট বা দূতাবাস স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।
- জরুরি সেবা: মৃত্যু, পাসপোর্ট নবায়ন বা ভ্রমণ সংক্রান্ত যেকোনো জরুরি কাজ দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।
- ব্যবসার সুরক্ষা: স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে দূতাবাসের সহযোগিতা ব্যবসায়িক পরিবেশকে নিরাপদ করতে সাহায্য করবে।
- আইনগত সহায়তা: স্থানীয় আইন ও কাগজপত্র সংক্রান্ত কাজগুলো আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত হবে।
মোজাম্বিকের অর্থনৈতিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশি প্রবাসীরা মোজাম্বিকের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। কৃষি পণ্য থেকে শুরু করে মুদি দোকান এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক খাতে তাদের সম্পৃক্ততা স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।
বর্তমানে, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবে তাদের সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মোজাম্বিকে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগ্রাম এবং সাফল্যের গল্প তাদের অসীম সাহসিকতার পরিচায়ক। তবে নিরাপত্তার অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, এবং দূতাবাসের অনুপস্থিতি তাদের জীবন ও ব্যবসায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় হাইকমিশনের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং প্রায় ১৮ হাজার প্রবাসীর জীবন সহজ করতে মোজাম্বিকে একটি কনস্যুলেট স্থাপন এখন সময়ের দাবি। সরকারের উচিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই দীর্ঘদিনের আক্ষেপ মেটানোর জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।