বিশেষ প্রতিবেদক |
দেশের বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট এর অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির পেশাদার জালিয়াতি চক্র। বড় বাজেটের সাব-কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়ার টোপ ফেলে এই প্রতারণা করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি ও ডিফেন্স টেন্ডার প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ ‘নোটিফিকেশন অফ অ্যাওয়ার্ড’ বা NOA (Notification of Award) শব্দটিকে পুঁজি করে এবং হুবহু জাল কাগজপত্র তৈরি করে এই চক্রগুলো ঠিকাদারদের বিভ্রান্ত করছে।
আসল নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি বা মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস (MES)-এর অধীনে কোনো ঠিকাদার যখন দরপত্রে অংশ নিয়ে চূড়ান্তভাবে কাজ পান, তখন অথরিটি তাকে একটি অফিশিয়াল চিঠি বা ‘NOA’ ইস্যু করে। এর অর্থ হলো কাজটির জন্য তাকে মনোনীত করা হয়েছে। এই নোটিফিকেশন পাওয়ার পর সরকারি আইন (PPR-2008) অনুযায়ী ঠিকাদারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংকে গিয়ে মোট বাজেটের একটি অংশ (১০% থেকে ১৭%) পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বা ব্যাংক গ্যারান্টি (BG) হিসেবে সরকারি অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টের বিপরীতে জমা দিতে হয়। এরপরই কেবল মূল চুক্তিপত্র সই বা ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যু করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারীকে এক টাকাও নগদ (Cash) দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
কিন্তু কনস্ট্রাকশন বাজারে সক্রিয় প্রতারক চক্রগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অবৈধ একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তারা ঠিকাদারদের বিশ্বাস অর্জন করতে কোনো বিলাসবহুল হোটেল বা ভুয়া কনসালটেন্সি ফার্মে মিটিংয়ের আয়োজন করে। এরপর কম্পিউটারে হুবহু সরকারি লোগো, সিল ও জাল স্মারক নম্বর ব্যবহার করে একটি নিখুঁত ‘ভিউয়ার নোটিফিকেশন (NOA)’ বা ওয়ার্ক অর্ডার প্রিন্ট করে ঠিকাদারের হাতে তুলে দেয়। এই জাল কাগজটি দেওয়ার সাথে সাথেই তারা ‘অথরিটি কমিশন’, ‘টেবিল মানি’ বা ‘কনসালটেন্ট ফি’ বাবদ কোটি কোটি টাকা নগদ দাবি করে। শর্ত দেওয়া হয় যে, এই নগদ টাকা না দিলে মোবিলাইজেশন ফান্ড (কাজ শুরুর সরকারি অগ্রিম টাকা) ছাড় করা যাবে না।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ডিবি পুলিশের একাধিক অভিযানে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরণের বড় বড় জালিয়াতি চক্রের মূল হোতারা গ্রেপ্তার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ভুয়া চক্রের হাতে নগদ অর্থ বা সিকিউরিটি চেক তুলে দেওয়ার পর যখন ঠিকাদাররা মূল প্রকল্প কার্যালয় বা সেনানিবাসের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফাইল ভেরিফিকেশনের জন্য যান, তখনই মূলত জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। ততক্ষণে চক্রটি কোটি কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়।
এই ধরণের বড় আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে যেকোনো বড় প্রজেক্টের সাব-কন্ট্রাক্ট নেওয়ার আগে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন না করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বা সেনানিবাসের ইঞ্জিনিয়ারিং শাখা থেকে ফাইল নম্বরটি যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।