রাষ্ট্রীয় সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বাংলাদেশে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত অধিদপ্তর ও পরিদপ্তর। তবে যুগের পর যুগ ধরে কিছু কিছু অধিদপ্তর নাগরিকদের কোনো প্রত্যক্ষ উপকার তো করতেই পারছে না, উল্টো অলাভজনক, অকার্যকর এবং চরম ভোগান্তির আখড়া হিসেবে সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এসব ‘শ্বেতহস্তী’ সংস্থাকে আমূল সংস্কার অথবা বিলুপ্ত করার দাবি এখন সর্বত্র। নাগরিকদের মতামত ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা আজ তুলে ধরছি এমনই ৫টি সমালোচিত অধিদপ্তরের চিত্র।
১. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ
জনগণের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গার নাম বিআরটিএ। একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স বা গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে নাগরিকদের যে পরিমাণ হয়রানি ও দালালের খপ্পরে পড়তে হয়, তাতে সাধারণ মানুষের চোখে এটি একটি চরম অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। যুগের পর যুগ ধরে ডিজিটাল সেবার কথা বলা হলেও, ডাটাবেজ সিস্টেমের ত্রুটি, বছরের পর বছর লাইসেন্স কার্ড আটকে থাকা এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি এই সংস্থাকে নাগরিকদের অন্যতম প্রধান ‘দুর্ভোগের কারণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর
দেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের বিপরীতে এই অধিদপ্তরের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ নাগরিক সমাজ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন রয়েছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এদের লোকবল ও প্রযুক্তির যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি এই অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে বড় কোনো মাদক সিন্ডিকেট ভাঙার কৃতিত্বের অভাব স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই অধিদপ্তরটি মূলত কিছু নির্দিষ্ট লাইসেন্স দেওয়া এবং ছোটখাটো খুচরা বিক্রেতা ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারায় একে একটি ব্যয়বহুল ও অকার্যকর সংস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়।
৩. রেলওয়ে কল্যাণ ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বাণিজ্যিক শাখা
বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান নিয়ে এমনিতেই মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। তার ওপর রেলওয়ের অধীনে থাকা কিছু কল্যাণ ও বাণিজ্যিক উইং যুগের পর যুগ ধরে বিপুল লোকসান গুনে যাচ্ছে। টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে ব্যর্থতা, অলাভজনক রুটে বছরের পর বছর ট্রেন চালিয়ে লোকসান বাড়ানো এবং ট্রেনের বিপুল পরিমাণ পতিত জমি ও লিজ দেওয়া সম্পত্তি থেকে সঠিক রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার কারণে সাধারণ নাগরিকরা মনে করেন, এই অলাভজনক শাখাগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থের স্রেফ অপচয়।
৪. পরিবেশ অধিদপ্তর
নদী দূষণ, বায়ু দূষণ ও অবৈধ ইটভাটার কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলো যখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে, তখন ‘পরিবেশ অধিদপ্তর’ পুরোপুরি ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে সাধারণ জনগণের অভিযোগ। নাগরিকরা মনে করেন, এই অধিদপ্তর পরিবেশ রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না। নামমাত্র কিছু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ছাড়া বড় বড় কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এদের কঠোর কোনো অ্যাকশন চোখে পড়ে না, যা একে একটি অকার্যকর দপ্তরে পরিণত করেছে।
৫. যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও সমবায় অধিদপ্তর
একবিংশ শতাব্দীর এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ঐতিহ্যবাহী পুরোনো ধাঁচের ট্রেইনিং কোর্সগুলো যুবসমাজকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক চাকুরিবাজারে টেক্কা দেওয়ার মতো দক্ষ করতে পারছে না। ফলে প্রতি বছর বিপুল বাজেট বরাদ্দ পেলেও শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানে এদের অবদান অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে, সমবায় অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে রয়েছে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। হাজার হাজার ভুয়া মাল্টিপারপাস বা কো-অপারেটিভ সোসাইটি সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেলেও এই অধিদপ্তর আগাম কোনো তদারকি বা ব্যবস্থা নিতে পারে না, যা একে নাগরিকদের চোখে চরম অকার্যকর করে তুলেছে।
সাধারণ মানুষের মতে, পরিবর্তিত বাংলাদেশে এখন সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করার উপযুক্ত সময়। যেসকল অধিদপ্তর জনগণের সেবা না দিয়ে উল্টো হয়রানি বাড়াচ্ছে বা লোকসান গুনছে, সেগুলোর কার্যক্রম আধুনিকায়ন করা, অথবা অপ্রয়োজনীয় শাখাগুলো বন্ধ করে দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলাই এখন সময়ের বড় দাবি।