২০২৪ সালের ০৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে চলে যাওয়ার পর, দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং আইনি বাধা উপেক্ষা করে তিনি চলতি বছরই (২০২৬) বাংলাদেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ও রাজনৈতিক অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন।
নির্বাসিত জীবনে থাকা শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশে ফেরা তাঁর ব্যক্তিগত কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা ক্ষমতার লোভ নয়। বরং এটি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমার এই সংগ্রাম।” তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না জানিয়ে আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পারিবারিক ট্র্যাজেডি এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো কঠিন ও মৃত্যুর মুখোমুখি সময় তিনি পার করে এসেছেন। প্রতিবারই যেভাবে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এবারও ঠিক সেভাবেই সব বাধা অতিক্রম করে তিনি তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে আসবেন।
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়; এটি বাংলার মাটি, মানুষের ইতিহাস এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। ৭৭ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে দলটি বারবার কঠিন সময়ের মুখোমুখি হলেও প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু বাংলাদেশবিরোধী শক্তি সুগভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতা পরিবর্তন করেছে, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। দলের ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও হাজারো মামলা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না; বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলটির সমর্থনে মিছিল করছেন, যা দলের পুনর্জাগরণের স্পষ্ট লক্ষণ।
শেখ হাসিনা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মূল ভিত্তি—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর চরম আঘাত হানা হয়েছে। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ এবং সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা মূলত বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টার অংশ।
একই সঙ্গে বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতার গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া চায় না। গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকার কোনো গোপন দর-কষাকষির বিষয় নয়; এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।” ভারতে অবস্থান করলেও তাঁর মন সবসময় বাংলাদেশে পড়ে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাবার সমাধি এবং প্রিয় দেশবাসীর কথা ভেবে তিনি প্রতিটি মুহূর্ত অস্থিরতায় পার করছেন এবং শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।