ব্রাজিলকে বলা হয় ফুটবলের দেশ। কেবল মাঠের পারফর্ম্যান্স বা ৫টি বিশ্বকাপ জয়ই নয়, ফুটবল খেলাটিকে ব্রাজিল একটি বিশাল অর্থনৈতিক লাভজনক শিল্পে রূপান্তর করেছে। ফুটবল থেকে ব্রাজিলের বাৎসরিক আয় কত, তার কোনো একক নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই; কারণ এই আয় একাধিক উৎস থেকে আসে। তবে স্পোর্টস ইকোনমি ও বিভিন্ন আর্থিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ফুটবল খাত থেকে ব্রাজিলের সার্বিক বাৎসরিক আয় প্রায় ২ থেকে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৪,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা)।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এবং সে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ব্রাজিলের ফুটবলের আয়ের প্রধান প্রধান উৎসগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ফুটবলার রপ্তানি বা প্লেয়ার ট্রান্সফার (সবচেয়ে বড় উৎস)
ব্রাজিল হলো বিশ্বের বৃহত্তম ফুটবলার উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ। নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো কিংবা এনড্রিকের মতো তরুণ প্রতিভাদের ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর কাছে বিক্রি করে ব্রাজিলিয়ান ক্লাবগুলো প্রতি বছর বিপুল অর্থ আয় করে।
-
স্পোর্টস ভ্যালুর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর কেবল প্লেয়ার ট্রান্সফার উইন্ডো থেকেই ব্রাজিলের ক্লাবগুলো গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪,৭০০ থেকে ৬,০০০ কোটি টাকা) আয় করে।
২. ব্রাজিলিয়ান ঘরোয়া লিগ ও ক্লাবগুলোর রাজস্ব
ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবল লিগ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ব্রাজিলের শীর্ষ ২০টি ক্লাবের (যেমন—ফ্ল্যামেঙ্গো, পালমেইরাস, করিন্থিয়ান্স) সম্মিলিত বাৎসরিক রাজস্ব প্রায় ১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকা) ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
টিভি স্বত্ব এবং প্রাইজমানি: লিগের খেলা সম্প্রচারের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন টেলিভিশন নেটওয়ার্কের কাছ থেকে ক্লাবগুলো প্রতি বছর প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ডলার আয় করে।
-
টিকিট বিক্রি ও ম্যাচ ডে আয়: স্টেডিয়ামে দর্শকদের টিকিট এবং সদস্যপদ বাবদ আসে প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন ডলার।
-
মার্কেটিং ও স্পন্সরশিপ: বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপ থেকে ক্লাবগুলো বছরে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। এর মধ্যে কেবল ‘ফ্ল্যামেঙ্গো’ ক্লাবটিই এককভাবে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধনী ক্লাব হিসেবে বছরে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব তৈরি করে।
৩. ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এর আয়
ব্রাজিল জাতীয় দল (সেলেসাও)-এর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা একটি লাভজনক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে। জাতীয় দলের গ্লোবাল ব্র্যান্ড ভ্যালুর কারণে তারা স্পন্সরশিপ থেকে বিপুল অর্থ পায়।
-
নাইকি, ইটাউ ব্যাংক, ভিভো-র মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর স্পন্সরশিপ, আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজন এবং ফিফা থেকে প্রাপ্ত অনুদান মিলিয়ে CBF-এর বাৎসরিক আয় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা)।
৪. পর্যটন, মার্চেন্ডাইজ এবং স্পোর্টস ইকোনমি
ব্রাজিল জাতীয় দলের ঐতিহ্যবাহী ‘হলুদ জার্সি’ বা মার্চেন্ডাইজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ফুটবল সামগ্রীর একটি। জার্সি, বুট ও ফুটবল সরঞ্জাম বিক্রি থেকে সে দেশের অর্থনীতিতে কোটি কোটি ডলার যুক্ত হয়। পাশাপাশি, ঘরোয়া লিগের বড় ম্যাচ বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট দেখতে প্রতি বছর লাখ লাখ বিদেশি পর্যটক ব্রাজিলে আসেন, যা দেশটির হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাত তথা সামগ্রিক জিডিপিতে বিশাল অবদান রাখে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ফুটবল ব্রাজিলের জন্য কেবল একটি বিনোদন বা আবেগ নয়; এটি দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, যা প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা সচল রাখে।