চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘সুরচক্র সঙ্গীত বিদ্যালয়’-এর ৫ম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, পুরস্কার বিতরণী ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। গত ২ জুলাই, বৃহস্পতিবার নগরীর জেলা শিল্পকলা একাডেমী অডিটোরিয়ামে অত্যন্ত উৎসবমুখর, দৃষ্টিনন্দন ও আনন্দঘন পরিবেশে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
বিদ্যালয়ের উত্তর কাট্টলী (মূল ক্যাম্পাস) ও চট্টেশ্বরী রোডের শাখার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, আমন্ত্রিত অতিথি, বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং শুভানুধ্যায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো মিলনায়তন যেন এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়।
মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে বর্ণিল এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (জেনারেল এডুকেশন) মাসুদুর রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার মো. ঈমাম হোসাইন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বেতার ও টেলিভিশন শিল্পী সংস্থার সভাপতি আব্দুল মান্নান রানা।
এবারের ৫ম বর্ষপূর্তির মূল আকর্ষণ ছিল চট্টগ্রামের সঙ্গীত ও বাদ্যজগতের তিন দিকপালকে ‘গুণীজন সংবর্ধনা’ প্রদান। সংবর্ধিত ব্যক্তিত্বরা হলেন— তবলাগুরু শিবু প্রসাদ চৌধুরী (প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, লয়কারী সঙ্গীত বিদ্যালয়), সঙ্গীতগুরু রিষু তালুকদার (প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, বাগীশ্বরী সংগীতালয়) এবং সঙ্গীতগুরু ফারুক আহমেদ (প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, রাগিনী সঙ্গীত বিদ্যালয়)। গুণীজনদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও উত্তরীয় তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।
বিদ্যালয়ের আবৃত্তি বিভাগের প্রশিক্ষিকা আঁখি দৃষ্টি-এর সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অতিথিবৃন্দ ও সংবর্ধিত গুণীজনরা নতুন প্রজন্মের মাঝে শুদ্ধ সংগীতচর্চা ছড়িয়ে দেওয়া, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সুস্থ সমাজ গঠনে সংস্কৃতিচর্চার অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরেন। আলোচনা সভায় সমাপনী ও ধন্যবাদ বক্তব্য রাখেন সুরচক্র সঙ্গীত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট সব্যসাচী আচার্য।
আলোচনা সভা ও গুণীজন সংবর্ধনা শেষে নজরুলসংগীত ‘তৃষিত আকাশ কাঁপে রে’ পরিবেশনার মাধ্যমে শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সুরচক্রের শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষকদের দলগত ও একক পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রাখে। অনুষ্ঠানে একক ও দলীয় কণ্ঠসংগীত, একক, দ্বৈত ও দলীয় গিটারবাদন, মনকাড়া ইউকুলেলে পরিবেশনা, দলীয় তবলায় লহড়া, বৃন্দ আবৃত্তি, চিত্রশিল্প প্রদর্শনী এবং দৃষ্টিনন্দন দ্বৈত ও দলীয় নৃত্য পরিবেশিত হয়।
কণ্ঠসংগীতে সুরের মূর্ছনা ছড়ান অবন্তিকা, অবন্তি, আরোহী, নিধি, কর্ণ, তনুশ্রী, অর্ণব, মৃত্তিকা, রুদ্র, সূচনা, দীপু, ময়না, দিবা, অয়ন, প্রেমা, ধ্রুব, পৃথা, প্রশিক্ষক অভিষেক দাশ এবং প্রশিক্ষক সব্যসাচী আচার্য। গিটারের ঝংকারে অংশ নেন আনিস, অরোরা, অর্ণব, অর্ঘ্য, আদ্র, নন্দিতা, তমাল, লাবিব, ইসমাইল, সৌমিক এবং প্রশিক্ষিকা তনুশ্রী আচার্য। ওয়েস্টার্ন ও ফোক মেলোডির মিশেলে ইউকুলেলে পরিবেশন করেন চন্দ্রিকা, রুদ্র, বন্যা, মেঘলা ও সূচনা।
তবলার জাদুকরী লহড়ায় দর্শকদের করতালি কুড়ান পৃথা, অয়ন, আপিত্য, অরিত্র, মেঘনা, ইতি, অংকুশ, অঙ্কিত ও পার্থ। বৃন্দ আবৃত্তির গম্ভীর উচ্চারণে ছিলেন চৈতী, দিবা ও অদ্যাত্রয়ী। চোখ ধাঁধানো নাচের ছন্দে মঞ্চ কাঁপান অবন্তী, টুসু, রিকন, অদ্রিজা, অঙ্কিতা দত্ত, প্রিয়ন্তী, মেঘা, উষ্ণতা, অন্বেষা, প্রশিক্ষিকা কাকলী লামা, প্রশিক্ষিকা নবনীতা কর নবা এবং সহ-পরিচালিকা কাঁশপি আচার্য পূর্ণা।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় যন্ত্রানুষঙ্গে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন প্রশিক্ষক জুডিসিয়াস চাকমা (কি-বোর্ড), প্রশিক্ষক যোসেফ ডায়েস (গিটার), প্রশিক্ষক অর্ঘ্য দাশ (তবলা), সঙ্গতকার রাজন বাহাদুর লামা (তবলা), ডেভিড দত্ত (কাহন) এবং টিটু চৌধুরী (অক্টোপ্যাড)। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে সফল করতে আয়োজক কমিটির সদস্য প্রশিক্ষক অমিত চৌধুরী, প্রশিক্ষিকা পূণম চৌধুরী, প্রশিক্ষক পার্বন ঘরজা ও প্রশিক্ষক সৌমেন দত্ত নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সবশেষে, রবীন্দ্রসংগীত ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানের সমবেত ও সমাপনী পরিবেশনার মাধ্যমে এক স্বর্গীয় ও মনোমুগ্ধকর আবহ তৈরি করে পর্দা নামে সুরচক্রের ৫ম বর্ষপূর্তি উৎসবের।
উল্লেখ্য, করোনাকালীন ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত সুরচক্র সঙ্গীত বিদ্যালয় শুরু থেকেই চট্টগ্রামে শুদ্ধ সংগীতচর্চা, শিল্প-সংস্কৃতির নিরবচ্ছিন্ন বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টির সাধারণ ও শিশু বিভাগে আটটি ভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে।