মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’র সংকটকে কেন্দ্র করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। একটি কার্গো জাহাজে রহস্যময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থা (IMO) সেখানে আটকে পড়া জাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে তীব্র ওঠানামা দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর মূল্য গত বৃহস্পতিবার এক লাফে প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে আজ শুক্রবার দাম ১.৮০ শতাংশ কিছুটা কমে গ্রিনিচ মান সময় ০৫:০০ টা নাগাদ প্রতি ব্যারেল ৭৪.১১ ডলারে নেমে এসেছে। ওমান উপকূলের কাছে ওয়ান রুট দিয়ে যাওয়ার সময় একটি মালবাহী জাহাজ ‘অজানা গোলার’ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আইএমও তাদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয়, যা মূলত বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ চার মাসের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করলেও, সাম্প্রতিক এই হামলার পর তা যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে এখনো প্রায় ২ শতাংশ ওপরে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালীর এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতে। আজ শুক্রবার ওমান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই উত্তেজনার জেরে এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোসপি’ (Kospi) সূচক আজ এক ধাক্কায় ৮ শতাংশ পড়ে গেছে। জাপানের ‘নিক্কেই ২২৫’ সূচক কমেছে প্রায় ৪.৬ শতাংশ। এছাড়া তাইওয়ানের ‘তাইএক্স’ ৩ শতাংশের বেশি এবং হংকংয়ের ‘হ্যাং সেং’ সূচক ১.৯ শতাংশ পতনের মুখ দেখেছে। বৈশ্বিক শান্তি বজায় থাকার সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত বুধবারও এই রুট দিয়ে ৭০টি জাহাজ পারাপার হয়েছিল, যা আগের দিনের চেয়ে দ্বিগুণ এবং ১ মার্চের পর সর্বোচ্চ। কিন্তু বৃহস্পতিবারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে স্বাভাবিক নৌচলাচল শুরুর সমস্ত আশায় বড় ধরনের জল ঢেলে দিল।
এদিকে এই হামলার নেপথ্যে ইরান জড়িত রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা, যা নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিবিএস নিউজ এবং রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বরাবরের মতোই এই অভিযোগ অস্বীকার করে ইরানের ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অননুমোদিত রুট ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট যেকোনো পরিণতির জন্য জাহাজের মালিক, অপারেটর এবং কমান্ডার নিজেই দায়ী থাকবেন।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই নতুন বাকযুদ্ধ এবং কৌশলগত জলপথে হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার চরম দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।